• রবি. জুলাই ১৯th, ২০২৬

সময় নিউজ

অনলাইন বাংলা নিউজ

ভেনিসের সিটি নির্বাচন:আলোচনায় বাংলাদেশি প্রার্থীরা

মে 18, 2026

ইতালির ঐতিহাসিক নগরী ভেনিসে আগামী ২৪ ও ২৫ মে সিটি কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এবারের নির্বাচন শুধু একটি শহরের প্রশাসনিক ভোটেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ইতালির জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে। কারণ, এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন পদে ১৭ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইতালীয় নাগরিক প্রার্থী হয়েছেন। তাদের মধ্যে ইতালির প্রধান বিরোধী দল Democratic Party (পিডি) সাতজনকে মনোনয়ন দিয়েছে।

এই প্রার্থীদের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছেন সৈয়দ কামরুল সারওয়ার ও রিতু মিয়া। দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি সংগঠন, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে সৈয়দ কামরুল সারওয়ার ইতোমধ্যে ভেনিসের অভিবাসী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর পরিচিত মুখ। অন্যদিকে রিতু মিয়া ভেনিসের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর নগর পরিকল্পনা, নাগরিক অধিকার, শিক্ষা ও বহুসাংস্কৃতিক সহাবস্থানের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। শিক্ষকতা করছেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আশার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই মনে করছেন, এই নির্বাচন শুধু কয়েকজন প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়; বরং ইতালিতে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও ইতালির মূলধারার রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ সেই বাস্তবতায় একটি নতুন সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তবে এই ইতিবাচক সম্ভাবনার পাশাপাশি উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিছু কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠী প্রার্থীদের রাজনৈতিক যোগ্যতা বা নাগরিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন না তুলে তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলছে, এটি নাকি “ভেনিসের নির্বাচন নয়, ইসলামাবাদের নির্বাচন।” এমনকি মুসলিম প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে ভেনিসে “শরিয়া আইন” প্রতিষ্ঠা করা হবে বলেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

ডানপন্থী দল Lega-র কিছু প্রচারণা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে “মসজিদ নয়” ধরনের স্লোগান লিখে তারা অভিবাসী মুসলিমদের উস্কানি দিয়েছে। বিভাজন মূলক রাজনীতি শুরু করেছে। সমালোচকদের মতে, এটি শুধু মুসলিম সম্প্রদায়কে নয়, বরং ইতালির বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেও অস্বীকার করার প্রচেষ্টা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপজুড়ে গত এক দশকে অভিবাসন, পরিচয় ও ধর্ম নিয়ে যে উত্তেজনা বেড়েছে, ভেনিসের এই নির্বাচন তারই প্রতিফলন। অথচ বাস্তবতা হলো—এই প্রার্থীরা সবাই ইতালির নাগরিক এবং স্থানীয় সমাজের অংশ। তারা ভেনিসের উন্নয়ন, পরিবেশ, আবাসন, গণপরিবহন ও নাগরিক অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান। কিন্তু নির্বাচনী আলোচনাকে এসব বাস্তব ইস্যু থেকে সরিয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অস্বস্তিকর সংকেত।

সিটি কাউন্সিলর পদের একমাত্র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী প্রার্থী রিতু মিয়া বলেন, “স্থানীয় রাজনীতিতে আমরা নতুন। কিন্তু আমাদের কাছে নতুন নতুন ধারণা আছে। নগরবাসী যদি আমাদের ভোট দেয়, আমরা তাদের হতাশ করব না।”

ভেনিসের সাংবাদিক পলাশ রহমান বলেন, এবারের ভেনিস নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, একসঙ্গে ১৭ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী ডান ও বাম- রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তিনি মনে করেন, এটি অভিবাসীদের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ ও রাজনৈতিক ভাবে পরিপক্ব হয়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়। তার ভাষায়, ভোটারদের উচিত প্রার্থীর যোগ্যতা ও দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনা করে ভোট দেয়া।

সব মিলিয়ে, ভেনিসের এবারের নির্বাচন শুধু একটি শহরের প্রশাসনিক প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ভোট নয়; এটি ইতালির সমাজ কতটা বহুত্ববাদকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত এবং অভিবাসী নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে কতটা স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারে—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.