মনির মোল্যা : ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দেশে খাদ্যের খুব অভাব দেখা দেয়। সেই অভাবের জন্য আপন চাচা মোমিন শেখের হাত ধরে মায়ের হাতের সেলাই করা হাফপ্যান্ট ও ছেড়া একটি শার্ট পড়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যান ১১ বছরের বালক ইদ্রিস আলী।
চুয়াডাঙ্গা জেলায় গিয়ে পেটের দায়ে মানুষের বাড়িতে ১৩ বছর মহিষ চড়ানোসহ যাবতীয় কৃষি কাজ করে বেড়ে ওঠেন ইদ্রিস আলী। এরমধ্যে জন্মস্থানের কথা মনে পড়লেও সঠিকভাবে ঠিকানা বলতে পারেন না তিনি। বাবার নাম, বড় ভাইয়ের নাম, নিজের গ্রামসহ ৪টি গ্রামের নাম ছাড়া তার কিছুই মনে ছিলো না। বয়স যখন ২৪শে পা রাখে তখন স্থানীয় কয়েকজনের সহযোগিতায় জহুরা আক্তার নামের একটি মেয়েকে বিবাহ করে ঘর সংসার শুরু করেন তিনি। দুটি মেয়ে সন্তান নিয়ে কোন মতে সংসার চলে। স্থানীয়রা চেষ্টা করেন ইদ্রিস আলীর জন্মস্থানের ঠিকানা জানার জন্য। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর একজন পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তার মাধ্যমে ইদ্রিস আলী খুজে পায় তার জন্মস্থান। বাড়িতে এসে গর্ভধারীনি মাকে দেখতে পেলেন না তিনি। গত দুই বছর আগেই তার মা মারা গেছেন। একমাত্র বড় ভাই আবু তালেবকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলেন ইদ্রিস আলী। ছোট ভাইকে পেয়ে বড় ভাই আবু তালেবও আনন্দে কাঁদলেন। হারিয়ে যাওয়া ইদ্রিস আলীর ফিরে আসার কথা শুণে শনিবার (২ ফেব্রুয়ারী) সকালে এলাকার শত শত মানুষ ভীর করলো আবু তালেবের বাড়িতে।
শনিবার (২ ফেব্রুয়ারী) বিকালে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বটরকান্দা গ্রামে আবু তালেব শেখের বাড়িতে গেলে বেড়িয়ে আসে এই তথ্য। ১৯৬০ সালে বটরকান্দা গ্রামে একটি দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন ইদ্রিস আলী। তার বাবার নাম গোপাল শেখ ও মায়ের নাম কালাবুড়ি। দুই ভাইয়ের মধ্যে ইদ্রিস আলী ছোট। হারিয়ে যাওয়ার ১২ বছর পর ইদ্রিস আলী বিয়ে করে ঘর-সংসার করেন। তার সংসারে দুটি মেয়ে জন্ম নেয়। মেয়ে দুটি বড় হলে তাদেরকে বিয়ে দেন। বর্তমানে ইদ্রিসের দুই মেয়ের ঘরে দুই নাতি সাব্বির হাসান ও জিহাদ হোসেন। সাব্বির চুয়াডাঙ্গা কলেজে পড়ালেখা করেন এবং জিহাদ নীলমনিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ট শ্রেনীতে পড়েন।
৪৬ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ইদ্রিস আলী এ প্রতিবেদককে বলেন, যুদ্ধের পরে অভাবের জন্য মা ও ভাইকে রেখে আপন চাচা মোমিন শেখের সাথে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। চাচা ও তার পরিবারবর্গ দিনাজপুর যাওয়ার সময় কুষ্টিয়া রেলস্টেশনের একটি হোটেলে আমাকে পেটে ভাতে রেখে যায়। কয়েকদিন পরেই হোটেলটি ভেঙ্গে দেয়। তখন সবাই যার যার মতো চলে যায়। আমি তখন একা পড়ে যাই। আমি কাঁদতে কাঁদতে রেলগাড়ীতে চড়ে একটি শহরে চলে যাই। শহরের মোমিনপুর রেলস্টেশনে নেমে ক্ষুধার জ¦ালায় কাঁদতে থাকি। এসময় একটি লোক এসে বলে বাবু তোমার বাড়ি কোথায়, তোমার কি ক্ষুধা লেগেছে। তখন আমার কোন কথা বের হয়নি। তারপর তিনি আমাকে নিয়ে একটি হোটেল থেকে রুটি খাওয়ায়। খাওয়া শেষে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি আমি কুষ্টিয়া জেলার কোতয়ালী থানার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামে মন্টু মিয়ার বাড়িতে আশ্রয় পেয়েছি। কয়েকদিন পরে মন্টু মিয়া আমাকে তার বাড়ির পাশে মাহতাব উদ্দীন বিশ্বাসের বাড়িতে রাখালীর কাজ ঠিক করে দেন।
অনেক কষ্টের মাঝে চলতে থাকে আমার জীবন। রাতে মা ও ভাইয়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে বালিশ ভিজে যায়। আর অনেককেই আমার বাবা, ভাই, গ্রাম বটরকান্দা ও তার আশপাশের রামকান্তপুর, চাউলিয়া, বিভাগদি গ্রামের কথা বলি। কিন্তু জেলা ও থানার নাম আমি বলতে পারি না বলে আমার মা ও ভাইয়ের সন্ধান কেউ বের করে দিতে পারে না। এইসবের মধ্যে দিয়ে ৮ বছর মাহতাব উদ্দীনের বাড়িতে রাখালী করি। ৮ বছর শেষে একই গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ন কবিরের বাড়িতে সামান্য বেতনে প্রায় ৫ বছর থাকি। এরপর আব্দুল মান্নানের বাড়িতে ১ বছর কৃষি কাজ করি। একই গ্রামের ডোরন মন্ডলের মেয়ে জহুরা আক্তারকে আমার সাথে বিবাহ দেন আব্দুল মান্নান ভাই। বিবাহের পরে অন্যর জমিতে কৃষি কাজ করে চলে আমার সংসার। আর মাঝে মাঝে মা ও ভাইকে পাওয়ার জন্য অনেক লোককে বলি। অবশেষে আব্দুল মান্নানের ভাতিজা গাজীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ অফিসারের চেষ্টায় কানইপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সহযোগিতায় নকুলহাটির মনিয়ার ও বটরকান্দার মুন্নু মাতুব্বারের মাধ্যমে আমি আমার গ্রামে ফিরেছি। আমার বড় ভাইকে পেয়েছি, কিন্তু পায়নি আমার মাকে।
কুষ্টিয়া জেলার কোতয়ালী থানার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের আব্দুল মান্নান এ প্রতিবেদকে বলেন, আসলে ইদ্রিস আলী একজন সাদা মনের মানুষ। ১০/১১ বছর বয়সে আমাদের গ্রামে থেকে বড় হয়েছে। বিয়ের বয়স হলেও ওর সাথে কেউ একটি মেয়ে বিয়ে দিতে চয়না। কারণ ইদ্রিসের নাম-ঠিকানা কেউ জানে না। কোথায় বাড়ি কোথায় ঘর। এমনকি ইদ্রিস নিজেও সঠিকভাবে বলতে পারে না তার পরিচয়। হিন্দু না মুসলমান তাও কেউ জানে না। শুধু তার ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হয়ে আমার গ্রামের ডোরন মন্ডলের মেয়ে জহুরা আক্তারকে বিয়ে দেই ওর সাথে। তারপর আমার জায়গায় একটি ঘর তুলে দেই থাকার জন্য। কয়েক ২ বছর পর ওদের সংসারে একটি মেয়ে জন্ম নেয়। পরে আরেকটা মেয়ে জন্ম নেয়। দুটি মেয়ে নিয়ে চলতে থাকে ইদ্রিসের সংসার। এর ফাকে বাড়ির ঠিকানা খুজতে থাকি আমরা সবাই। বছর খানেক ধরে আমার এক ভাতিজা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসার শিলন মিয়া প্রত্যাকটা জেলায় জেলায় বটরকান্দা, রামকান্তপুর, বিভাগদি গ্রামগুলি কোন জায়গায় খুজতে থাকে। এক পর্যায়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের মাধ্যমে আমরা ইদ্রিস আলীর গ্রামের ঠিকানা খুজে পাই। তারপর আমরা ওকে বটরকান্দা গ্রামে নিয়ে যাই।
ইদ্রিস আলীর বড় ভাই আবু তালেব জানান, স্বাধীনের পরেই অভাবের জন্য ইদ্রিসকে আমার চাচা মোমিন কুষ্টিয়া রেলস্টেশনের সাথে একটি হোটেলে রেখে দেয়। ২৫ দিন পরে চাচা বাড়ি এসে ওর ঠিকানা দিলে ঐখানে ছুটে যাই ওকে আনতে। কিন্তু কুষ্টিয়া রেলস্টেশনে গিয়ে আমার ভাইকে পাই না। স্থানীয় লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করি হোটেলটি কোথায়। তারা বলে হোটেলটি অবৈধ বলে ভেঙ্গে দিয়েছে। তারপর ভাইকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। তারপর থেকে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় আমার ভাইকে খুজেছি তবে পাইনি। এক সময়ে আমরা ভেবে নিয়েছি, ইদ্রিস হয়তো বেঁচে নেই। কয়েক বছর আগে এক লোক এসে আমাকে বললো আমি আপনার ভাই। কিন্তু আমার। আমি তখন বললাম সালথা, কিন্তু ওতা বিশ্বাস করলো না। তারপর আবার বললো আপনি মিথ্যা কথা বলছেন, ভালো করে বলেন আপনার বাড়ি কোথায়। তারপরও বললাম না। তখন বললো আপনার মুখ খুলুন, ওর কথায় আমি হেসে দিলাম, তখনি বললো আপনি আমার তালেব ভাই। ছোট সময়ে গরুতে আপনার সামনে উপরের একটি দাঁত ভেঙ্গে ফেলে। একথা বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে থাকে। আমিও কেঁদে দিলাম। কিছুক্ষন পরে আমি বললাম আমার ছোট ভাই ইদ্রিসের বাম পায়ে হাটুর নিচে একটা বড় ক্ষত আছে। একথা বলতে না বলতেই পায়ের ক্ষত দেখালেন। এরপর ছোট-বেলার দুই ভাইয়ের দুষ্টমির কিছু কথা বললেন। এসব কথা শুণে আমি আনন্দে কাঁদতে থাকি। তারপর বাড়িতে নিয়ে আসি। এই আমাদের হারিয়ে যাওয়া ইদ্রিস। আমার আদরের ছোট ভাই।
