• বুধ. এপ্রিল ২২nd, ২০২৬

সময় নিউজ

অনলাইন বাংলা নিউজ

সাংবাদিক জাহিদুর রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসেই বদলে গেল ওদের স্ট্যাটাস

এপ্রিল 2, 2020

ছবিঃ জাহিদুর রহমান

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে
নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং হোম কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে আজ থেকে কঠোর অবস্থানে সেনাবাহিনী।

কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ তো আর ঘরে থাকলে পেট চলবে না তাই প্রতিদিনের মতো আজও বেড়িয়েছিল কাজের সন্ধানে। কোদাল, টুকরী আর খন্তি নিয়ে আরিচা মহাসড়কের পাশে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় জমায়েত হয়েছিল কাজের আশায়।

এরা সবধরনের কাজ করে, ইট ভাঙা, নির্মাণকাজ, রাজমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রির সহকারী, কাঠমিস্ত্রি, বস্তা টানা, মাটি কাটা, ড্রেন পরিষ্কার থেকে শুরু করে সব।

শ্রমজীবী অসহায় এইসব মানুষদের বুধবারের দিনটিই শুরু হলো অন্যভাবে। ভোর থেকে জমায়েত হয়ে-ও যেখানে কাজ পাচ্ছিলেন না,আচমকা সেখানে খাবার সামগ্রী নিয়ে হাজির হলেন প্রশাসনের এক কর্তা।

এর পেছনে আছে আরোও একটি কাহিনী, সাভারে বসবাসরত এনটিভির সিনিয়র রিপোর্টার ও এনাম মেডিকেল কলেজের পরিচালক জাহিদুর রহমান ভোরে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে এই খেটে খাওয়া মানুষদের দেখে একটি স্ট্যাটাস দেন। যে স্ট্যাটাসে ফুটে এই মানুষগুলোর চরম বিপর্যয়ের কথা।

আর এভাবেই সাভারে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিক জাহিদুর রহমানের একটি স্ট্যাটাসে বদলে দেয় অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি দিন।

এই মানুষগুলোর প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয় প্রশাসন।

গণমাধ্যমকর্মীর স্ট্যাটাস দেখে নিজেই উদ্যোগী হয়ে তাদের কাছে ছুটে যান সাভারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ।

তিনি জানান,করোনাভাইরাসের ব্যাপক বিস্তার ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এই সময়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাইরে না বের হওয়ার নির্দেশনার পাশাপাশি বিদেশ ফেরত সবাইকে বলা হয়েছে কোয়ারেন্টিনে থাকতে।

সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে বেসামরিক প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। উপজেলা প্রশাসনের তরফে ইউনিয়ন পর্যায়ে সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আমরা নিজেরাও অসহায় দস্থ শ্রমজীবী মানুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছি খাবার।

গত ১ এপ্রিল এনটিভির সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ও সাভার মিডিয়া ক্লাবের সভাপতি জাহিদুর রহমানের দেয়া একটি স্ট্যাটাস নজর কাড়ে আমার।

অসহায় শ্রমজীবী মানুষদের দুটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন,

“সামাজিক দূরত্ব কি- এটা ওরা জানে না। সরকারি বিধি নিষেধ মানার মতোও খুব একটা গরজ নেই ওদের। কেবল জানে, কাজ না করলে পেট চলবে না। আর এটাও শুনেছে, নতুন করোনাভাইরাস নামের অদৃশ্য এক দৈত্য লন্ডভন্ড করে দিচ্ছে স্বাভাবিক জীবনের সবকিছু। প্রাতঃভ্রমণে পথ চলতে দেখা অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে কথা হলো। না। তারা কারও কোনো সাহায্য সহযোগিতা পায়নি।

অথচ করোনায় ছুটি ঘোষণার কারণে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া এই মানুগুলোর সমস্যাটাই জটিল । আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি সবাইকে তাদের পাশে দাঁড়াতেই নির্দেশ দিয়েছেন,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন,কেউ যেন বাদ না পড়ে। এই দুঃসময়ে কেউ সুযোগ নিলে, কোনো অভিযোগ পেলে আমি ছাড়ব না। বিন্দু পরিমাণ অনিয়ম সহ্য করা হবে না।

দিনের আলো ফোটার সঙ্গে দেখবেন “মানুষের হাটে” জড়ো হয়েছেন এমন অসংখ্য শ্রমজীবী।

এরা কাজের সন্ধানে আসা উত্তর জনপদের মানুষ। যাদেরকে এই সমাজ ব্যঙ্গ করে ডাকে “মফিজ”।

নিজ এলাকায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে তালিকা করলে বাস্তবে এদের দেখা পাবেন না। আবার কাজের সন্ধানে ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় এদের নাম নেই। তাহলে এরা সাহায্য পাবে কি করে?

তাই শ্রমজীবী এই মানুষ গুলো কাজের সন্ধানে যেখানে এসেছেন সেখানেই আমাদের তৎপরতা বাড়াতে হবে।

কাজ নেই। তাই দিনে এনে দিনে খাওয়া এই মানুষদের হাতে সঞ্চিত অর্থ-ও নেই।

সামর্থের মধ্যে আপনার-আমার মহানুভবতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেই। এই সংকটের পেট চালানোর মত কিছু সাহায্য পেলেই এ মানুষদের মুখে হাসি ফুটবে।”

গণমাধ্যমকর্মীর এই স্ট্যাটাসটা আমাদের নজরে আসা মাত্রই সিদ্ধান্ত নেই এই মানুষদের পাশে আমাদের দাঁড়ানো প্রয়োজন।

খেটে খাওয়া এসব মেহনতি মানুষের জন্য আমরা মাথাপিছু ১০ কেজি চাল ৩ কেজি আলু, ১ কেজি পেঁয়াজ, ১ লিটার সোয়াবিন তেল,১ কেজি মসুর ডাল ও একটা সাবান বড় একটি প্যাকেট করে তা হাতে তুলে দিয়েছি।

আমাদের উদ্দেশ্য, একটি মানুষ-ও যেন না খেয়ে থাকে।

দেশে নভেল করোনাভাইরাসের মহামারী ঠেকাতে
সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং হোম কোয়ারেন্টিনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে
বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় মাঠে রয়েছে সেনাবাহিনী।
আমরা চাই সবাই ঘরে থাকুক। প্রয়োজনে আমরা ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দেব। এই রোগটির যাতে আর বিস্তৃতি না ঘটে সেজন্য আমাদের সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে।

অপ্রত্যাশিত ত্রাণ পেয়ে খুশি ইটভাটার শ্রমিক মমিন মিয়া।

তিনি জানান, তিনদিন ধরে কাজের সন্ধানে এসেও কোন কাজ পাই নাই। ঘরে চাল নাই।

অভিন্ন কথাই বলছিলেন রাজমিস্ত্রির যোগালি দেওয়া শ্রমিক আব্দুল হাই (৩২)।

তিনি জানান গত পাঁচ দিন ধরে কোন কাজ পান নি। অবরুদ্ধ প্রতিদিন খরচ হয়ে গেছে ৬০ টাকা।

কোন সাহায্য সহযোগিতা না পাওয়ায় ধারদেনা করে চলছিলেন তিনি।

প্রশাসনের তরফে পাওয়া খাদ্য সামগ্রী হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তিনি বলছিলেন,

হঠাৎ দেখি প্রশাসনের লোক আইছে। প্রথমে ডরাই ছিলাম। ভাবছিলাম ঘরে না থাইকা কাজের সন্ধানে আসাতে আমাগো বুঝি ধইরে নিবো।

কিন্তু দেখলাম, আমাগো লাইনে দাঁড় করাইয়া প্রত্যেকের হাতেই চাল, ডাল, তেল, পিঁয়াজ,আলু আর সাবান দিছে।

সরকার যদি আমাগো দিকে একটু তাকায় তাইলে আমাগো আর কষ্ট থাকবো না- যোগ করেন আব্দুল হাই।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments