বিজয় পোদ্দার : ফরিদপুর জেলার গেরদা ইউনিয়নের আলোকিত মানুষ মরহুম আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান। ব্যক্তিজীবনে ফরিদপুরের সর্বস্তরে একজন শিক্ষানুরাগী হিসেবে বহুশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। শৈশব থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
জনকল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেছেন আলহাজ্ব আব্দুল খালেক ডিগ্রী কলেজ, আলহাজ্ব আব্দুল খালেক উচ্চ বিদ্যালয়, আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান বাজার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান পোস্ট অফিস, আলহাজ্ব আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান বাজার, আব্দুল জব্বার ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, চরজোয়াইর দয়ারামপুর মোল্লাপাড়া জামে মসজিদ, খালেক চেয়ারম্যান বাজার পশু হাসপাতাল, দুটি গোরস্থানসহ অসংখ্য শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
১৯৬৯ সালে এলাকার মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেন। ব্যাপক ভোটে নির্বাচিত হয়ে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৫ বার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তিনি এলাকার উন্নয়নে নিবেদিত ভাবে কাজ করেছেন। একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম বলিষ্ঠ কৃষক পরিবারের সন্তান ছিলেন তিনি। নিজের সম্পদ বিক্রি করে এবং দান করে তিনি কেবলই শিক্ষার উন্নয়ন ও মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজ করেছেন।
গেরদায় বিদ্যুৎতায়ন, বাখুন্ডা বাজার উন্নয়ন, নারীদের কর্মসংস্থান ও অধিকার আদায়েও তিনি ছিলেন সচেষ্ট। গেরদার মহিলা রোড বলে পরিচিত যে সড়কটি তিনি তৎকালীন সমস্ত সড়কটি নারী শ্রমিক দিয়ে নির্মাণ করিয়েছিলেন, তাই জায়গাটির নাম মহিলা রোড নামে পরিচিতি পায়।
একটি সময়ে মাটির রাস্তা বাঁশের সাঁকো, দূর্গম পথ পার হয়ে গেরদা এলাকার মানুষকে শিক্ষার জন্য আসতে হতো শহরে। জীবন যাত্রার মান এমন উন্নত ছিলো না। কুপির আলো আর হ্যারিকেনের সাহায্যে রাত্রী পার হতো মানুষের। দারিদ্র সংগ্রামের চাবুকে বেশীরভাগ মানুষই ছিলো দূর্বল। তিনি তার যৌবণকালের সংকল্পকে মানুষের উন্নয়ন আর কল্যাণে নিয়োজিত করেছিলেন। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে তিনি স্ত্রী পুত্রদেরও সময় দেননি। শুধু মানুষের কাজ নিয়ে ছুটে বেড়াতের বিভিন্ন জায়গায়।
ক্ষেতের ধান,পাট ফসল বিক্রি করে তিনি নানা কাজে অংশ নিয়েছেন। এই মানুষটি শিক্ষার ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রেখেছেন। বর্ষা মৌসুমে যখন গেরদায় থেকে হাতে গুনা কিছু সংখ্যক মানুষ স্কুলে যেত, তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন, তার দাদা তাকে স্কুলে যাবার জন্য একটি ঘোড়া কিনে দিয়েছেন। অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় একবার ঘোড়া থেকে পরে গিয়ে তিনি মারাত্মক আহত হয়েছিলেন। সে থেকে তার পরিবার ছেলের প্রতি মায়া করে আর স্কুলে যেতে দেয়নি। পরবর্তীতে তিনি ব্যক্তি জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। গ্রামের হতদরিদ্র মানুষকে সুশিক্ষিত হবার মধ্য দিয়ে জীবনকে গঠনের তাগিদে তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। তিনি গজারিয়া কৃষ্ণারডাঙ্গি উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন অনেকদিন। হাবেলী দয়ারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪০ বছর ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন। বিসমিল্লাহ শাহ দরগাহ কমিটির সভাপতি ছিলেন অনেকদিন। তিনি আমৃত্যু মানুষের জন্য কাজ করেছেন।
মরহুম আব্দুল খালেক চেয়ারম্যান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৫ সালে। পিতা : আব্দুল জব্বার মাতুব্বর এলাকার সমাজ সেবক এবং সম্ভ্রান্ত মুসলিম গোরস্ত পরিবার। মাতা- আমিরুন্নেসা গৃহীনি, স্ত্রী আমেনা বেগম, এক মেয়ে, চার ছেলে। সকলেই ব্যবসায়ী, শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। ৩০ আগস্ট ২০১৫ সালে ৮০ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
দীর্ঘবছর ধরে ফরিদপুরের গেরদায় এই পরিবারের বসবাস। আগামী ৩০ আগষ্ট তার তৃতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। দিনটি পালনে পারিবারিক ভাবে ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আব্দুল খালেক স্মৃতি পরিষদ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ফরিদপুরের মানুষের কাছে এই মানুষটি বেঁচে থাকুক কর্মউদ্দিপনা আর শিক্ষা অনুরাগের প্রভাতফেরী হিসেবে।
