• মঙ্গল. জুলাই ২৮th, ২০২৬

সময় নিউজ

অনলাইন বাংলা নিউজ

“হারকিউলিস” সৎ মায়ের ক্রোধের দহনে খাঁটি এক বীর

অক্টো. 9, 2021

 

ছবিঃ ইমু হোসাইন (লেখক)

আপনারা নিশ্চয় English For Today for Classes Eleven and Twelve বইতে Myth and Literature ইউনিটে মহাবীর হারকিউলিস (Hercules) সম্পর্কে পড়েছেন। আমাদের আজকের আয়োজন আপনাদেরকে হারকিউলিসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এবং আজ আমরা আপনাদের জানাবো কীভাবে দেবীর অভিশাপগ্রস্থ শিশু একদিন মহাবিশ্বের মহাবীর হয়ে উঠে।
কে এই হারকিউলিস?
গ্রিক পুরাণের অর্ধ-দেবতা ও বীর হেরাক্লিসের (Heracles) রোমান সংস্করণ হারকিউলিস (Hercules)। বীর হারকিউলিসের জন্ম থিবসে। তিনি দেবতা ও মানুষ, কারণ তিনি গ্রিক দেবতাদের দেবতা জিউসের পুত্র। তাঁর মা আল্কমিনা একজন মানুষ যার স্বামীর নাম ছিল অ্যাম্ফিট্রিয়ন। আল্কমিনার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জিউস তাঁর প্রেমে পরেন আর এরইমধ্যে আল্কমিনার স্বামী অ্যাম্ফিট্রিয়ন টেলেবিয়নদের বিরুদ্ধে এক অভিযানে যান। সেই সুযোগে দেবরাজ জিউস এক রাতকে তিন রাতের সমান প্রলম্বিত করে অ্যাম্ফিট্রিয়নের ছদ্মবেশে আল্কেমিনার সঙ্গে সঙ্গমে মিলিত হোন আর ফলে মহাবীর হারকিউলিসের জন্ম হয়।
হারকিউলিসের শৈশবঃ
জিউসের ঔরসে অন্য নারীর সন্তান হওয়ায় হারকিউলিসের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেবরাণি হেরা তাঁকে কখনোই ক্ষমা করেনি। হারকিউলিস যখন শিশু তখনই হেরা তাঁকে হত্যা করার জন্য দুটি সাপ পাঠায়। ঘুমন্ত শিশু হারকিউলিস জেগে উঠে এবং শিশু হওয়া সত্ত্বেও ওই ভয়ঙ্কর প্রাণী দুটির গলা চেপে ধরে মেরে ফেলে। হারকিউলিস সম্পর্কে তখন থিবসের অন্ধ নবি টাইরেসিয়াস বলেছিলেন, “এই শিশু হবে বিশ্ব সভ্যতায় বীরদের উদাহরণ।”
পুরাণের অন্য একটি সংস্করণ অনুযায়ী হেরার ক্রোধ থেকে তাঁর নবজাতক শিশুকে বাঁচাতে আল্কমিনা শিশু হারকিউলিসকে একটি বাগানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে আসেন। ঘটনাচক্রে জ্ঞান আর রনকৌশলের দেবী মিনারভা তাঁকে অনাথ পরিত্যক্ত শিশু হিসেবে হেরার কাছে দিয়ে আসেন লালন পালন করার দাবিতে। হেরা শিশুটিকে তাঁর স্তন পান করাতে থাকেন কিন্তু শিশু হারকিউলিস তাঁর সৎ মায়ের স্তনে স্বজোরে কামড়ে দেয়। এতে হেরার স্তন থেকে রাতের আকাশে দুধ নির্গত হতে থাকে আর তাতেই তৈরি হয়ে যায় মিল্কিওয়ে। পরবর্তীতে হেরা শিশুটিকে মিনারভার কাছে ফিরিয়ে দেন আর তাকে নিজেকেই উক্ত শিশুর লালন পালনের দায়িত্ব নিতে বলে। মিনারভা শিশুটিকে তারপর থেকে তাঁর নিজের স্তন পান করিয়ে বড় করে তোলেন। এভাবেই দুই প্রধান দেবীর স্তনপানে হারকিউলিস হয়ে উঠেন মর্ত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ।
পরিনত হয়ে উঠার গল্পঃ
যৌবনের শুরুতেই হারকিউলিসকে অশ্বারথারোহণ, কুস্তি, তির, সংগীত ইত্যাদি শিক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে অর্পণ করা হয়। কিন্তু তিনি ভুলবশত তাঁর সমর শিক্ষক সেন্টর কিরনকে এবং রাগের মাথায় বীণা দ্বারা আঘাত করে তাঁর সংগীত শিক্ষক লিনাজকে হত্যা করেন। খুনের শাস্তি হিসেবে হারকিউলিসকে বিয়োটিয়া সীমান্ত এলাকার কিথারিয়নে নির্বাসন দেওয়া হয়। সেখানে তিনি থেসপিয়া নগরীকে একটি হিংস্র সিংহের কবল থেকে রক্ষা করেন এবং থেবসবাসিদের অর্কেমোনাসদের থেকে মুক্ত করেন। আর এই ঘটনায় খুশি হয়ে থেবসের রাজা কিরন হারকিউলিসের সাথে তাঁর নিজ কন্যার বিয়ে দেন।
দুই সন্তানসহ সুখে স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটছিল হারকিউলিস আর রাজকন্যা মেগারার সংসার। কিন্তু হেরার ক্রোধ তার পিছু ছাড়েনি কখনোই। স্থায়ী হয়নি সেই সুখ সৎ মা হেরার কারণে। তিনি একসময় হারকিউলিসের ভাবনায় এমন উন্মত্ততা ঢুকিয়ে দিলেন যে, বীর যোদ্ধা নিজের ছেলেদের জন্মপরিচয় নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে লাগলেন ওই সন্তানরা তাঁর চির প্রতিদ্বন্দ্বী টাইরাইন্স রাজ্যের রাজা ইউরেস্থিউসের ঔরসে মেগারার গর্ভে জন্ম নিয়েছে। ফলে তিনি ক্রোধে পাগল হয়ে তির ছুঁড়ে মতান্তরে, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন তার দুই সন্তানকে।
হেরার আরোপিত যাদুর রেশ কেটে যাওয়ার পর হারকিউলিস বুঝতে পারেন তিনি কি বিশাল ভুল করে ফেলেছেন। প্রচণ্ড ভয় আর অনুতাপে আত্মহত্যার পথে হাঁটছিলেন এই মহাবীর। কিন্তু পরবর্তীতে বন্ধু থেসেউসের পরামর্শে তিনি আবার সেচ্ছানির্বাসনে যান।
হেলিকন পর্বতে নির্বাসিত হারকিউলিসকে বিশুদ্ধ করান থেস্পিয়াস। এরপর তিনি সেখান থেকে ডেলফিতে যান। সেখানে দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির ছিল। অ্যাপোলোর কাছ থেকে জানতে চান যে কীভাবে তাঁর কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করা সম্ভব। এসময় হারকিউলিসকে টিরিনসের রাজা ইউরেস্থিউসের সেবা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বলা হয়, হারকিউলিসকে ওই রাজার অধীনে বারো বছর থেকে রাজা যতগুলো কাজ তাকে করতে দেবেন, সবগুলো করতে হবে। বদলে হারকিউলিস পাবেন দেবতাদের মতো অমরত্ব!

হারকিউলিসের পক্ষে এই নির্দেশ হজম করতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু শাস্তি কি আর মধুর হয়? পছন্দ না হলেও ডেলফি মন্দিরের আদেশ মোতাবেক হারকিউলিস তাঁর বীরত্বের ধারেকাছেও নেই এমন ব্যক্তির অধীনে কাজ করতে গেলেন শুধু পিতা জিউসের অভিসাপের ভয়ে।
এই সুযোগে তাকে বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করছিলেন রাজা ইউরেস্থিউস। এই লক্ষ্যে তিনি একটার পর একটা দুর্ধর্ষ কাজ দিতে থাকেন হারকিউলিসকে, আর একটার পর একটা কাজ থেকে বের হয়ে আসতে পারলেও আবার তাকে মৃত্যু অনিবার্য বা ব্যর্থ হওয়ার কাজ দেওয়া চলতে থাকে। কিন্তু সর্বদাই সফল হয়ে ফিরে আসেন হারকিউলিস।
ইউরেস্থিউস আসলে হারকিউলিসকে দশটি কাজ করতে দিয়েছিলো। কিন্তু কাজগুলো শেষে, ইউরেস্থিউস দুটো কাজকে মেনে নিলো না। প্রথমটি লার্নিয়ার হাইড্রাকে হত্যা করার সময় লোলাউস তাকে সাহায্য করেছিলো বলে আর দ্বিতীয়টি অজিয়াস নামক স্থান পরিষ্কার করার পরে হারকিউলিস মজুরি গ্রহণ করেছিলেন বলে।
এ দুটো কাজের পরিবর্তে চতুর ইউরেস্থিউস আরও দুটো বেশি কাজ হারকিউলিসকে চাপিয়ে দেয়। ফলে মোট কাজের সংখ্যা দাঁড়ায় বারোটি। এই কাজগুলোই পরবর্তীতে Twelve Labours of Hercules নামে পরিচিতি পায়। আর ‘অসাধ্য কর্ম’ বোঝাতে আমরা আজও একটি ইংরেজি phrase ব্যবহার করি। তা হলো ‘Herculean Task’
হারকিউলিসের প্রথম দশটি কাজ হলো
১) নিমিয়ার সিংহকে হত্যা করা
২) লার্নিয়ার ৯ মাথা বিশিষ্ট হাইড্রাকে হত্যা করা
৩) সেরিনিয়ার হরিণ ধরে আনা
৪) ইরিম্যান্থিয়ার শূকর ধরে আনা
৫) একদিনের মধ্যে অজিয়ার আস্তাবল পরিষ্কার করা
৬) স্টিম্ফেলিয়ার পাখি হত্যা করা
৭) ক্রিট দ্বীপের ষাঁড়কে (যাকে বলা হয় ক্রেটান বুল)

৮) ডায়োমেডেসের মাদি ঘোড়া চুরি
৯) অ্যামাজনদের (বিখ্যাত মহিলা যোদ্ধার দল) রাণি হিপোলিটা-র কোমর বন্ধনী সংগ্রহ করা
১০) গেরিয়ন নামক দানবের গবাদি পশুর দলকে ধরে আনা

পরে যোগকৃত কাজ দুটো হলো
১১) হেস্পেরিডিস-এর আপেল চুরি করা
১২) পাতালের অভিভাবক সেরবেরুস-কে ধরে নিয়ে আসা
এভাবেই সৎ মায়ের ক্রোধ আর যাদুর ফলাফলে হারকিউলিস হয়ে উঠেন মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ বীর আর অমরত্ব লাভ করেন মানুষের স্মৃতিতে, সাহিত্যে, গল্পে।

লেখক-
মো. ইমু হোসাইন
প্রভাষক
ইংরেজি বিভাগ
ইকবাল সিদ্দিকী কলেজ, গাজীপুর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.