গতবছর ২০২২ সালের জুন মাসে সুইডেন সরকার একটি ঘোষনা দেয় যে, সুইডেনে চাকরি খোঁজার ভিসা চালু করবে। অতীতে এরকম একটি ভিসা চালু ছিল যা শুধু যারা সুইডেনে মাস্টার্স শেষ করেছে তাদের জন্য। কিন্তু এই “নতুন” ভিসায় সবাই আবেদন করতে পারবে। ফলে যথারীতি শুরু হয় ইউ টিউব বা ফেসবুক ভিত্তিক বাটপারি। হাজার হাজার আবেদন.. কিন্তু শুরুতেই বাতিল প্রায় সবগুলি। কারন সুইডেনে নিয়ম না জেনে আবেদন করে লাভ নেই, আর এই ভিসা সবার জন্য না।যে জিনিসগুলি অনেকেই বুঝে নাই,, সেগুলি হলো
১. পরিষ্কার করে লেখা নেই তবে এটি সত্য যে, আপনি অনার্স পাশ হলেই আবেদন করতে পারবেন না।
২. আপনাকে কমপক্ষে মাস্টার্স বা পি এইচডি ডিগ্রি থাকতে হবে, সোজাকথায় সত্যিকার উচ্চ শিক্ষিত হতে হবে।
৩. যে কোন ডিপ্লোমা / এডভান্স ডিপ্লোমা / কারিগরি / মাদ্রাসা শিক্ষা / অনার্স পাশ,,,এগুলি হলে হবে না।
৪. আপনি ২ বা তার বেশি বছর আগে পাশ করে থাকলে চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। চাকরি অবশ্যই এমন হতে হবে যেটার চাহিদা সুইডেনে আছে। (কোথাও এটি লেখা নেই তবে এটি সত্য )
৫. নতুন পাশ করা কারো চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলেও হবে। সেক্ষেত্রে ভিসা হবার সম্ভবনা খুবই কম।
৬. ব্যবসা করার জন্য এই ভিসা চাইতে পারবেন , তবে সেক্ষেত্রে আগে ব্যবসার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, এছাড়া সুইডেনের সাথে সামজ্ঞস্য পূর্ন ব্যবসার পরিকল্পনা থাকতে হবে। পর্যাপ্ত টাকা এবং টাকার পরিষ্কার উৎস থাকতে হবে।
৭. বাংলাদেশ থেকে অনার্স বা ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি পাশ করে অথবা বেশি পড়ালেখা না করে,,, যারা বিভিন্ন আরব দেশে গেছেন এবং বর্তমানে অনেক ভালো চাকরির অভিজ্ঞতা এবং টাকা আছে,,, উনারা আবেদন করবেন না। ভিসা হবে না। কারন পড়ালেখায় মাস্টার্স পাশ লাগবেই।
৮. যে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করলেই হবে না বরং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এর রেজিস্ট্রার্ড অথবা সরকারি বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ের মাস্টার্স পাশ হতে হবে। ৩ বছরের অনার্স + এক বছরের মাস্টার্স এরকম হলে হবে না। কারন এরকম চার বছরের পড়ালেখাকে সুইডেনে অনার্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৯. সুইডেন থেকে আপনার সকল পড়ালেখার সার্টিফিকেট যাচাই বাছাই করে (Universitets- och högskolerådet /UHR) তারপর সুইডিশ সার্টিফিকেট দেয়া হবে, এরপর সেই সার্টিফিকেট বিবেচনা করে ইম্মিগ্রেশন দেখবে ভিসা দেয়া যায় কি না। শুধু এই প্রক্রিয়ার জন্য ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে।
১০. এই দীর্ঘমেয়াদি আবেদন প্রক্রিয়া, যারা খুব তাড়াতাড়ি ভিসা চান, তাদের জন্য এটি না। সব মিলিয়ে ভিসা হাতে পেতে প্রায় ১ বছর সময় লাগতে পারে।
১১. যাদের ইউরোপের অন্য কোন ভালো দেশের মাস্টার্স অথবা সুইডেনের মাস্টার্স ডিগ্রি আছে, উনারা সহজেই এই ভিসা পেতে পারবেন।
১২. আপনার যদি মনে হয় যে, কারো বা এজেন্সির সাহার্য্য লাগবে এই ভিসা আবেদন করতে তবে ১০০% নিশ্চিত থাকুন আপনি যোগ্য না। যারা শুধু নিজে নিজেই আবেদন করতে পারবেন, তারাই যোগ্য।
১৩. কিছুটা জটিল এবং সময় সাপেক্ষ হলেও এই ভিসা পাওয়া সম্ভব। ফলে ইন্ডিয়া পাকিস্তান সহ অনেক দেশ থেকেই অনেকেই এই ভিসা পাচ্ছেন। বাংলাদেশের সমস্যা হলো, যোগ্যরা আবেদন করে না বা খোঁজ করে না বরং কানাডা অস্ট্রেলিয়ার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে। আর যাদের যোগ্যতা নেই তারা অনেকেই আবেদন করে। ফলে ভিসা হয় না।
১৪. সর্বোচ্চ ৯ মাসের ভিসা পেতে পারেন এবং বৌ পরিবার নিয়ে সুইডেনে যাবার কোন সুযোগ নেই।
১৫. সুইডেনে সরকারি চিকিৎসা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাবেন না, দেশে থেকেই ভালো ইন্সুরেন্স কিনে সুইডেনে যেতে হবে।
১৬. সুইডেনে চাকরির অফার পেলেও আপনি সাথে সাথে চাকরি শুরু করতে পারবেন না। সব কাগজপত্র ঠিক করে প্রথমে চাকরি দাতাকে আপনার জন্য ওয়ার্ক পারমিট আবেদন করতে হবে এরপর চাকরি করতে পারবেন। ওয়ার্ক পারমিট পাবার কমপক্ষে চার বছর পরে স্থায়ী ভাবে সুইডেনে থাকার আবেদন করতে পারবেন। ওয়ার্ক পারমিট পাবার পরে বৌ পরিবার সুইডেনে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রেও ভালো বেতন ও নিজ নামে বাসা বা ঠিকানা থাকতে হবে।
১৭. এই ভিসা মেয়াদ বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে দেশে ফেরত যেতে হবে। নতুন করে দেশ থেকে আবার ভিসা নিয়ে সুইডেনে যাওয়া যাবে। তবে উপযুক্ত চাকরি পাওয়া সাপেক্ষে সুইডেনের ভিতরে থেকেই ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
১৮. ডাক্তার এবং নার্স, কনস্ট্রাকশন বা ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার, ইলেকট্রিশিয়ান, ডাইভিং – বাস/ ট্রাক / ট্যাক্সি , উকিল, সেলসম্যান ইত্যাদি এরকম বহু পেশা আছে যেগুলিতে কেউ আপনাকে সুইডেনে নিয়োগ দিবে না।
১৯. এবার নিন সুইডেনে চাকরি পাবার নিনজা টেকনিক। দেশ থেকে অনলাইনে আর সুইডেনে যাবার পর প্রথম ৬ মাস,,, দিনে রাতে ২৪ ঘন্টা শুধু একটি চেষ্টা করুন তা হলো ভাষা শিক্ষা। ৬ মাস পরে যদি ভাষা শিখে ফেলতে পারেন তবে চাকরির অভাব হবে না। এরপরের ৩ মাস সত্যিকার চাকরি খোজ করুন। আশাকরি সফল হবেন। আর শুরুতেই ভালো চাকরির লোভ করলে আম ছালা দুটিই হারাতে হতে পারে। শুধু আইটি সেক্টরে সুইডিশ ভাষা না জানলেও চাকরি পাওয়া সম্ভব হতে পারে যদি সত্যিকার যোগ্য হন।
২০. আগের মত রাজনৈতিক আশ্রয় বা বয়স কম তাই মানবিক আশ্রয় ইত্যাদি “বাটপারির” কথা ভুলে যান, সুইডেনে এসব একেবারেই বন্ধ করার আয়োজন শুরু হয়েছে। সুইডেনে ঢুকে ইউরোপের অন্য দেশে চলে যাবেন, এরকম মানসিকতা থাকলে এই ভিসা আবেদন করবেন না। আপনার একটি ভিসার জন্য সামনের দিনের হাজার ভিসা নষ্ট হোক এটি আসলে আমি অন্তত চাই না।
আমার জানামতে গতবছরের জুন মাসে এই ভিসা চালু হবার পরে এই বছরের জুন পর্যন্ত ভারতীয় বেশ কয়েকজন আইটি সেক্টরে ভিসা পেলেও বাংলাদেশ থেকে ভিসা পেয়েছেন মাত্র ২ বা ৩ জন।
