• বুধ. এপ্রিল ২২nd, ২০২৬

সময় নিউজ

অনলাইন বাংলা নিউজ

প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি সদয় না হলে আমাদের আরও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে-অ্যাডভোকেট মোঃ আনোয়ার হোসেন

জুন 5, 2020

প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি সদয় না হলে আমাদের আরও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে-অ্যাডভোকেট মোঃ আনোয়ার হোসেন

আজ শুক্রবার (০৫জুন) বাংলাদেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। কলম্বিয়া ও জার্মানির যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের ১৪৩ টি দেশে একযোগে যথাযোগ্য মর্যাদায় এ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় Biodiversity বা জীববৈচিত্র্য। ২০১১-২০২০ সময়কে (Decade on Biodiversity) হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘ। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তাই নিয়েই আমাদের পরিবেশ। পরিবেশ বলতে সাধারণত মাটি, পানি, বায়ু,তাপ,আলো, শব্দ, উদ্ভিদ এবং প্রাণী এসবই পরিবেশের উপাদান। ভৌগোলিক গত কারণে পৃথিবীর বহু দেশে পরিবেশের বিভিন্ন তারতম্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশ ও এর বাইরে নয়। ষড়ঋতু দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিত। বসন্ত কে ঋতুর রাজা বলে সম্বোধন করে থাকি। এই সময় প্রকৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য নতুন আঙ্গিকে মেলে ধরে প্রকৃতি পায় তার নিজস্ব সজীবতা আমরা প্রাণভরে নির্মল বাতাসে মুকুলের পাগল করা ঘ্রাণ অনুভব করি। বেঁচে থাকার স্বপ্ন যেই প্রকৃতি সেই প্রকৃতির প্রতি আমরা কতই না নিষ্ঠুর আচরণ করি! প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণ না করলে আমাদের আরও দুর্ভোগের শিকার হতে হবে। আজ প্রকৃতি নিরবে প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। প্রতিনিয়তই অদৃশ্যভাবে হামলা চালিয়ে কেড়ে নিচ্ছে সহস্রাধিক প্রাণ। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কখনো বেঁচে থাকা সম্ভব নয় প্রকৃতি কে বন্ধু ভাবুন এবার বন্ধুর জন্য আজকের এই দিনে একটি করে বৃক্ষ রোপণ করে বন্ধুকে উৎস্বর্গ করি! দেখবেন প্রকৃতি কখনো বেঈমানি করবেনা।
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশের ভারসাম্য ধরে না রাখার ফলে পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ুর পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্যে এখন হুমকীর মুখে। আমাদের দেশে কিছু অসাধুচক্র আমাদের নদ-নদী,খাল-বিল,হাওর-বাওর, নদী-নালা কে দখল ও দূষণ করে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটিয়েছে। মিল কারখানার বর্জ্য বিষাক্ত করে ফেলেছে নদীর পানি। নদী হারাচ্ছে নাব্যতা, ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নদীপথ, এমনকি পয়ঃনিষ্কাশনের পথও হারাতে বসেছি আমরা। আমাদের সবুজ শ্যামল বাংলার অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব বৈচিত্রে নেমে আসছে পরিবেশের মহাবিপর্যয়। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে ঢাকা-চট্রগ্রাম শহর। তৈরি হচ্ছ জলাবদ্ধতা, নষ্ট হচ্ছে রাস্তাঘাট, ব্যহত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা।
ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা গত ১০ বছরে ৮৬ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সাধারণত ইটভাটা আর শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া,গণপরিবহনের ধোঁয়া, নির্মাণাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের আবর্জনা এই তিনটি উৎস থেকে দূষিত হচ্ছে বায়ু। এসব দূষিত বায়ুর কারণে প্রতিনিয়তই বাড়ছে শ্বাসকষ্ট জনিত ফুসফুসে ক্যানসার সহ এজমার মত প্রাণঘাতী রোগ। ঢাকার পরেই নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার ৷ গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বায়ু দূষণ সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করে ৷ সরকারের আইন তোয়াক্কা না করে অপরিকল্পিত ভাবে ইটভাটা নির্মাণ করে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে । ইট ভাটাগুলো বায়ু দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী৷
জীবন ধারণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পানি। আজ ভূগর্ভস্থ পানিও দুষিত হচ্ছে। কলকারখানার অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্যামিকেল ব্যবহৃত পানি পুরোদমে নদী-নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর সুস্বাদু মাছগুলো মরে যাচ্ছে বিলীন হচ্ছে বিরল প্রজাতির জলজ প্রাণী।
তাছাড়া পানি দূষণ পুরো জীববৈচিত্রকে প্রভাবিত করে। এটি প্রমাণিত হয়েছে যে পানি দূষণ বিশ্বজুড়ে মৃত্যু এবং রোগের প্রধান কারণ। শুধুমাত্র পানি দূষণের কারণেই প্রতিদিনই বিশ্বে প্রায় ১৪০০এরও বেশি লোকের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে আনুমানিক ৮০জন মানুষ পানি দূষণ সম্পর্কিত অসুস্থতা প্রতিদিনই মারা যায়।
এবার শব্দ দুষণের কথা বলি, বাংলাদেশে শব্দদূষণের মাত্রাও ভয়াবহ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নর্মালি এই মাত্রা হওয়া উচিত ৬০-এর কম এনবিএম৷ কিন্তু ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায়, যেমন নিউমার্কেটের সামনে ওভারব্রিজের নীচে অথবা শাহবাগ বা গুলিস্তানে যদি যান, তাহলে দেখবেন সেখানে এনবিএম ১১০ থেকে ১২০ পর্যন্ত ওঠে৷ এটা কখনোই ৯০-এর নীচে নামে না৷ বাংলাদেশে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২.৭ ভাগ৷ শুধুমাত্র বায়ু দূষণে ক্ষতি হয় ২০ হাজার কোটি টাকা৷ দূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হয় শিশুরা৷ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলেও বাংলাদেশের পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে৷ শিল্পকারখানাগুলো অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা,গাজীপুর ও নারায়ণগন্জে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নীচে নেমে যাচ্ছে ৷ ৭১৯টি তৈরি পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার বর্জ্য দূষণের অন্যতম উৎস৷ এক টন কাপড় উৎপাদন করতে নদীতে বর্জ্য যাচ্ছে ২০০ টন ৷ ইস্পাত কারখানাগুলো থেকে ১ লাখ কোটি লিটার এবং কাগজ কারখানাগুলো থেকে ৪৫ হাজার কোটি লিটার দূষিত বর্জ্য পানিতে মেশে৷ ফলে খাল ও নদীসহ অন্যান্য জলাশয়ের পানিও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে ৷ ঢাকার পাশাপাশি ছোট জেলা শহরগুলোতে জলাশয় ভরাট, দখল ও দূষণ চলছে ৷ আমরা চাচ্ছি টেকসই উন্নয়ন,কিন্তু পরিবেশ ও নদীগুলোর জলপ্রবাহের সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন কি করে সম্ভব? আমাদের ও আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নদী ও পরিবেশ বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম। বিশ্বে উন্নয়নের নামে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়ে বিভিন্ন মারণাস্ত্র তৈরী করছ। যুদ্ধ করে বোমা ফাটিয়ে আনবিক বোমার পরীক্ষা ও প্রয়োগ করে নদী দখল ও দূষণকরে গাছপালা নিধন, বনজঙ্গল উজার করে ও রাসায়নিক অস্ত্রের ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্যপ্রাণী ও পশুপাখি শিকার ও ভক্ষণ করে গাড়ি, ও কলকারখানায় জীবাশ্ম তেল ও ক্যামিকেল ব্যবহার ও গ্রীন হাউজ গ্যাস (কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড, মিথেন প্রভৃতি) নির্গত করে পৃথিবীটাকে অগ্নিপিণ্ডে রুপান্তরিত করছে। প্রকৃতি ও জীবজগতকে প্রকম্পিত ও বিপন্ন করে ফেলছে। পক্ষান্তরে মানুষ আজ তার নিজের অস্তিত্বকেই হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে অথচ মাটি পানি বায়ুসহ ইত্যাদির আন্তঃসম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমে বা ইকোসিস্টেমের (বাস্তুতন্ত্রের )সাথেই আমাদের জীববৈচিত্র্য ঘনিষ্ট ভাবে জড়িত। আর পরিবেশে বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী অনুজীবের প্রাপ্যতা ও বৈচিত্র্যই হলো Biodiversity বা জীববৈচিত্র। পরিবেশের অবক্ষয় জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব টিকে থাকার জন্যই জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কেননা পরিবেশে উদ্ভিদ এবং প্রাণী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। যেমন উদ্ভিদ সূর্যের আলো পানির সাথে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরী করে। উদ্ভিদ নিজে এ খাদ্য গ্রহণ করে এবং প্রাণীও এ খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। প্রাণী নিজের খাদ্য নিজে তৈরী করতে পারেনা কাজেই পৃথিবীর সকল প্রাণীর খাদ্যের জন্য উদ্ভিদের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নির্ভর করতে হয়। তাছাড়া উদ্ভিদ অক্সিজেন ত্যাগ করে মানুষ তা গ্রহণ করে এবং মানুষ কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগকরে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এছাড়াও অনেক উদ্ভিদ হচ্ছে কীটপতঙ্গের আবাস্থল। অর্থাৎ উদ্ভিদ এবং প্রাণী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। এই করোনাকালীন সময়ে পরিবেশ অনকটাই তার নিজের মতকরে সাজিয়ে নিয়েছে। আসুন! জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ বান্ধব বিশ্ব গড়ে তুলতে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে উদ্যোগী হই।

অ্যাডভোকেট মোঃ আনোয়ার হোসেন
কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক,
বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments