
তিন বাচ্চার মা ভেগে গেলেন এক সিকিউরিটি গার্ডের সাথে। তার বাবা আর স্বামী দৌড়ে চলে এলেন ডিবি অফিসে। সূর্য ডুবার আগেই তাকে উদ্ধার করার তাড়া এলো। নাহয় বেচারা স্বামী আর কণ্যাদায়গ্রস্ত পিতা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না! অন্যদিকে তিন বাচ্চার নাওয়া-খাওয়া বন্ধের বিষয়টি তো আছেই। সব মিলিয়ে পরিবারটির চরম অসহায়ত্ব দেখে খুব মায়া লেগে গেলো। তাই হাতের অন্যসব কাজ সাইডে রেখে স্ত্রী-কণ্যা-জননীরূপী সেই নারীকে দ্রুত উদ্ধার করতে দ্রুত কাজ শুরু করে দিলাম। দেখতে দেখতে দুই দিন চলে গেল, কিন্তু কোন গতি করতে পারলাম না। তাদের দু’জনকে ফিক্স করা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো। খুব চালাক! এদিকে ভুক্তভোগী দুই জামাই-স্বশুড় মিলে আমার অফিসে অস্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসল। তাদের নাওয়া-খাওয়া সব অফিসেই চলতে লাগলো। সবকিছু বিবেচনায় আমারও বিরক্ত হবার কোন জো নেই।
শেষমেশ তৃতীয় দিন উত্তরবঙ্গের একটি জেলাশহর থেকে দুই কপোত-কপোতীকে উদ্ধার করা হলো। আমার টিমের সবার মধ্যেও একটা তৃপ্তির হাওয়া লক্ষ্য করলাম। সবাই শুধু তিনটা শিশুর কথা ভাবছিল। সেটা ভেবেই সবাই অপেক্ষা করছিল এই স্বার্থপর(!) নারীকে চরমভাবে বকা দেয়ার জন্য। যাহোক, যুগলবন্দীদের যুগল ভেঙ্গে দুইজনকে দুই গাড়িতে উঠানো হলো। তারপর আমরা বিজয় বেশে ঢাকার উদ্দেশ্য রওয়ানা দিয়ে দিলাম। তিন শিশু, এক পিতা আর হতভাগা স্বামী প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার জন্য ঢাকায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
রাতের শেষভাগ। তখন আমরা যমুনা সেতু অতিক্রম করছি। একটা আয়েসি ভঙ্গিতে মাইক্রোর সীটে গা হেলিয়ে দিয়ে নদীর টলমলে জলের দিকে তাকিয়ে দিলাম একটা ঘুম।
-খুব বড় মাপের একটা সাক্সেকসফুল অপারেশন করলেন, না!
একটা নারী কন্ঠ যেন আমার কর্ণ বিদীর্ণ করে মস্তিষ্কের কেন্দ্রভাগে সজোরে একটা কুঠারাঘাত করলো। পিছন ফিরে তাকালাম। অন্ধকারের মাঝে সেই বিদ্রোহিণীর তপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমি আহত হলাম। তার দৃষ্টির দৃঢ়তা দেখে বুঝলাম আমি কোথাও একটা ভুল করে বসে আছি। ব্যস, শুনতে লাগলাম অনর্গল বলে যাওয়া তার জীবনের হৃদয়বিদারক ইতিহাস। দুঃশ্চরিত্র বাবার একাধিক বিয়ে, ত্রুটিপূর্ণ শৈশব, বাবার পিস্তলের গুলী থেকে অল্পের জন্য রক্ষা, কৈশোরেই বুড়ো শিল্পপতির সাথে জোরপূর্ব বিয়ে, ওয়ার্কোহলিক/কাজপাগল স্বামীর চরম অবহেলা, ঘরে ব্যস্ত রাখতে অধিক সন্তান ভূমিষ্ট করতে বাধ্য করা, স্বামীর বহুগামীতাসহ নানাভাবে মানসিক ও শারিরীক নির্যাতনের ঘটনা প্রভৃতি শুনে আমি আপ্লুত হয়ে গেলাম। খুব সহজেই পুরো ঘটনার একটা মনস্তাত্ত্বিক চিত্র স্পষ্টতর হয়ে উঠলো। অস্বাভাবিক এই জীবন তার বিবেকটা ভোতা করে দিয়েছে। যে কারণে সে হয়ে উঠতে পারেনি কোন কণ্যা, কিংবা স্ত্রী কিংবা মা। এই সম্পর্কগুলো গড়ে উঠার জন্য ন্যুনতম একটা মানবিক বা স্বাভাবিক পরিবেশের প্রয়োজন হয়, যা সে জন্মের পর থেকে পায়নি। সে বেড়ে উঠেছে শুধুই একটি প্রাণী হয়ে। তার মনের ভিতর বিগত ২০ বছরে ধীরে ধীরে সঞ্চিত হয়েছে সাগর পরিমাণ ক্রোধ। তার সেই ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটেছে এই অনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে। এটাই তার সর্বোচ্চ বিদ্রোহ। সম্মানী পিতা আর বিজনেস ম্যাগনেট স্বামীর সম্মানে চরম আঘাত দেয়ার লক্ষ্যেই সে সিকিউরিটি গার্ডের সাথে প্রেম করেছে। আর, তার গুরুত্ব বুঝিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই নাকি সে সবকিছু ছেড়েছুড়ে পালিয়েছে। তার মতে এ সমাজে নারীর জন্য কোন সম্পর্কই অনুকূলে নয়। না বাবা, না ভাই, না স্বামী, না সন্তান – কোনটাই না।
আসলেই কি তাই নয়?
পুরুষতান্ত্রিকতার সর্বোচ্চ শিখরে বসে থেকে নারীর অধিকারকে আমরা ধর্ম কিংবা সামাজের দোহাই দিয়ে বঞ্চিত করি, যেন ধর্ম কিংবা সমাজ কিংবা পরিবার কিংবা সম্পর্ক রক্ষার দায় শুধুই নারীর। বহুগামী পুরুষ স্বাধীনচেতা নারীকে বেশ্যা বলে গালী দেয়। ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভে সামিল হয়েও আমরা নারীর তৃতীয় বিয়েকে তার অধিকার না ভেবে কটাক্ষ করি। নিজ স্ত্রীকে আবরণে আবৃত রেখে অন্যের বেপর্দা স্ত্রী’র শরীরের ভাজ উপভোগ করি। প্রিয়তম হিসেবে উপহার পাওয়া প্রেমিকা/স্ত্রী’র ব্যক্তিগত ছবিগুলো তাকে যৌনদাসী বানিয়ে রাখতে অস্ত্র হিসেবে গলায় ধরি। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা ইগো’র জন্য নিজ নারীকে নানা কায়দায় ব্যবহার করি।
নারীর জন্য সার্বজনীন সম্পর্ক বলে কিছু আছে কি? আছে, আবার নাইও। কারণ, তার ‘না’ বলার অধিকার নেই। এই ‘না’ টা যে আসলেই ‘না’ সেটা প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষমতা তার নেই। তাদের এই ‘না’-কে মেনে নিতেই মানবসভ্যতার লেগে যাচ্ছে মিলিয়ন বছর। তবুও যদি হয়!
মোদ্ধাকথা,
যেদিন বাড়ির গৃহকর্মীও নারীর মর্যাদা পাবে, সেদিনই পুরো মানব জাতি পরিশুদ্ধ হবে। তার আগে নয়।
লেখকঃ সানী সানোয়ার
পুলিশ সুপার, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট, বাংলাদেশ পুলিশ।
