মাল্টার দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি ও তীব্র শ্রমঘাটতির কারণে দেশটি বর্তমানে নন-ইইউ (Non-EU) কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে হসপিটালিটি, ট্যুরিজম, কেয়ার সেক্টর, কনস্ট্রাকশন, ক্লিনিং ও সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে তৃতীয় দেশের কর্মীদের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাল্টায় কর্মরত নন-ইইউ কর্মীদের মধ্যে কয়েকটি দেশ স্পষ্টভাবে প্রাধান্য বিস্তার করেছে।
📊 মাল্টায় নন-ইইউ কর্মীদের জাতীয়তা অনুযায়ী হার
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী মাল্টায় নন-ইইউ কর্মীদের জাতীয়তা ভিত্তিক হার নিম্নরূপ—
• ভারত – ২৭%
• নেপাল – ১৬%
• ফিলিপাইন – ১৫%
• কলম্বিয়া – ৬%
• আলবেনিয়া – ৪%
• সার্বিয়া – ৪%
• পাকিস্তান – ৩%
• তুরস্ক – ৩%
• বাংলাদেশ – ২%
• যুক্তরাজ্য (নন-ইইউ হিসেবে) – ২%
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে মাল্টার শ্রমবাজারে ভারতীয়, নেপালি ও ফিলিপিনো কর্মীরাই সবচেয়ে প্রভাবশালী। তারা দীর্ঘদিন ধরেই মাল্টার বিভিন্ন খাতে কাজ করে আসছে এবং নিয়োগকর্তাদের( Employer) কাছেও আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।
🌍 কেন এগিয়ে ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইন?
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি দেশের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
• কার্যকর কূটনৈতিক উপস্থিতি ও দূতাবাসের সক্রিয় ভূমিকা
• শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী সরবরাহ
• নিয়োগকর্তা ও সরকারি দপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ
• কর্মীদের ডকুমেন্টেশন ও ভিসা প্রক্রিয়ায় সমন্বিত সহায়তা
বিশেষ করে ফিলিপাইন সরকার বিদেশে শ্রম রপ্তানিকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করে। ভারত ও নেপালও ইউরোপীয় শ্রমবাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে।
মাল্টায় বাংলাদেশের বাস্তবতা: সুযোগ থাকলেও অংশগ্রহণ কম
অন্যদিকে, বাংলাদেশি কর্মীদের হার মাত্র ২ শতাংশ, যা মাল্টার শ্রমঘাটতির বাস্তবতায় অত্যন্ত নগণ্য। এটি আরও বিস্ময়কর কারণ—বর্তমানে ইউরোপের অনেক দেশ বাংলাদেশি কর্মীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিলেও মাল্টা এখনো বাংলাদেশিদের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও ইতিবাচক একটি শ্রমবাজার।
হসপিটালিটি, কেয়ার ও সার্ভিস সেক্টরে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজ করার সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও, এই সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
🏛️ কূটনৈতিক দুর্বলতা ও দূতাবাস সংকট
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, মাল্টায় বাংলাদেশি কর্মীদের কম উপস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো কূটনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
বর্তমানে—
• মাল্টায় বাংলাদেশের কোনো হাইকমিশন বা দূতাবাস নেই
• মাল্টা সংক্রান্ত কূটনৈতিক দায়িত্ব গ্রিসে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের আওতায়
• অভিযোগ রয়েছে, ওই দূতাবাস মাল্টার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের সম্ভাবনা যথাযথভাবে প্রচার, সমর্থন বা সমন্বয় করছে না
এর ফলে মাল্টার নিয়োগকর্তা( Employer) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশি শ্রমবাজারের কার্যকর সংযোগ তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রতিযোগী দেশগুলো সক্রিয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের কর্মীদের এগিয়ে দিচ্ছে।
💼 অর্থনৈতিক সম্ভাবনা হারানোর ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাল্টার মতো একটি স্থিতিশীল ও শ্রমঘাটতিপূর্ণ ইউরোপীয় বাজারে পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি। কারণ—
• প্রবাসী আয় ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে
• দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না
• ইউরোপীয় শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও উপস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ছে
এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মাল্টার শ্রমবাজারেও বাংলাদেশ আরও প্রান্তিক হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
📌 করণীয় কী?
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও প্রবাসী কমিউনিটির মতে, অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
• মাল্টায় একটি বাংলাদেশ হাইকমিশন বা অন্তত কনস্যুলার অফিস স্থাপন
• শ্রমবাজার ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরকারি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সক্রিয় যোগাযোগ
• বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করা
• প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, তথ্য ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা
মাল্টা এখনো এমন একটি ইউরোপীয় দেশ যেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বাস্তব সুযোগ রয়েছে। তবে কূটনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ও পরিকল্পনার অভাবে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে, মাল্টার শ্রমবাজারে বাংলাদেশ আরও পিছিয়ে পড়বে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
