
মনির মোল্যা, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যেদিকে চোখ যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজ পাটক্ষেত। “সোনালী আঁশে ভরপুর, ভালোবাসি ফরিদপুর”—এই স্লোগান যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে এ জনপদে। তবে উৎপাদনের সম্ভাবনা ভালো থাকলেও বেড়ে যাওয়া খরচ ও বাজারদরের অনিশ্চয়তায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সালথায় প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত এবং কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধির কারণে আবাদ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
(৩ মে) রবিবার উপজেলার মাঝারদিয়া, আটঘর, গট্টি, রামকান্তপুর, ভাওয়ালসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাটক্ষেতে কাজ করছেন কৃষকরা। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ সার প্রয়োগ করছেন, আবার কেউ পোকামাকড় দমনে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। জমিতে শ্রমের চাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়ও।
স্থানীয় কৃষক সিরাজ শেখ বলেন, “এবার পাটের গাছ ভালো হয়েছে, মাঠ দেখে মন ভরে যায়। কিন্তু খরচ এত বেড়েছে যে লাভ নিয়ে শঙ্কায় আছি। ডিজেল ও তেলের দাম বাড়ায় সেচ খরচ অনেক বেড়েছে। বাজারে যদি ভালো দাম না পাই, তাহলে লাভ তো দূরের কথা, খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে যাবে।”
আরেক কৃষক আবু মোল্যা জানান, “আগে এক বিঘা জমিতে পাট চাষে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন সেই খরচ বেড়ে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। শ্রমিকের মজুরি, সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম সবকিছুই বেড়েছে। এতে কৃষকরা চাপে পড়ে গেছে।”
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ সংগ্রহ, সার প্রয়োগ, সেচ, আগাছা পরিষ্কার ও পোকামাকড় দমন—সব মিলিয়ে ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সেচ খরচ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধিও ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, পাটের বাজারদর নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। কৃষকরা জানান, গত বছর তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া গেলেও প্রতি বছরই দামের ওঠানামা থাকে। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ন্যায্য মূল্য না পেলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পাটের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও ভর্তুকি বাড়ানোর দাবিও জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন শিকদার বলেন, “গত বছর কৃষকরা পাটের ভালো দাম পেয়েছেন, সে কারণেই এ বছর আবাদ বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “পাট পচানোর জন্য প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা থাকবে বলে আমরা আশা করছি। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, কৃষকরা যেন তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতভাবে পান।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখতে হলে কৃষকদের খরচ কমানো এবং পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে, যা দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
৩ মে ২০২৬
