• বুধ. এপ্রিল ২২nd, ২০২৬

সময় নিউজ

অনলাইন বাংলা নিউজ

হারিনি, আমরা হারবোও না

এপ্রিল 20, 2020

ডাঃ সাবিহা সুলতানা
মেডিকেল অফিসার (গাইনি ও অবস বিভাগ)
লালকুঠি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষন প্রতিষ্ঠান,
মিরপুর-১,ঢাকা

আমি একজন চিকিৎসক । আজকের এই আঠার কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে, প্রতি রাতে ঘুমোতে যাবার আগে আমিও প্রার্থনা করি, ইস্ রাত্রি শেষে সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখতাম আজকের এই করোনা মহামারি শুধুই আমার একটা দুঃসপ্ন ছিল। সব কিছু আগের মতোই আছে। সকালের সূর্য্য উঠা , সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া ব্যস্ত শহরের কোহাহল, মানুষের অভিরাম ছুটাছুটি চলে. . . সব যেন আগের মতোই রয়েছে । জানি এ কেবলই আমার অচেতন মনের চাওয়া, আগামী বিশ্বের কথা, আমার দেশের কথা চিন্তা করেও জেগে উঠছি বার বার, আর দুচোখ জলে ভরে হয়েছে একাকার।
বাঙ্গালী জাতির কর্ণধার, সাধারন জনগন এই যে আপনারা যারা বলছেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙ্গালীর হাতে মেশিনগান, কামান, ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ ছিল না, বাঙ্গালী তার লাঠি সোটা , বাশঁ, খাত্তা , শাবল যার যা ছিল তাই নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।
ডাক্তার তুমিও ঝাপিয়ে পড়ো। পিপিই নাই তাতে কি হয়েছে ?? আপনাকে , হ্যা আপনাকেই বলছি, একদিন বাঙ্গালী ঝাপিয়ে পড়েছিল এক দৃশ্যমান শত্রæর বিরুদ্ধে, তার হাতে ছিল লাঠি সোটা , বাশঁ , খাত্তা , শাবল। আর আজ আমরা ডাক্তাররা লড়ে চলছি, এক অজানা, অদেখা, অচেনা শত্রæর বিরুদ্ধে। যাকে মোকাবেলা করতে দাবী করেছিলাম শুধুমাত্র পিপিই। যা ঐ একাত্তর এর মতো বাঁশ লাঠি সোটা আর খাত্তার এর মতোই এর চেয়ে বেশী কিছু তো না। আজ আমরা স্বল্প করে হলেও পিপিই পাচ্ছি । আমাদের সরকার পিপিই দিচ্ছে। কিন্তু জাতি আজ যতবড় ক্ষতির মুখে পড়লো, যতবড় রতœ বাংলার বুক থেকে হারিয়ে গেল, কে নেবে এই অপূরনীয় ক্ষতির দায়ভার? জাতির পক্ষে এরকম জ্ঞানগর্ভ, মেধাবী , আত্মমননশীল, সৃষ্টিশীল, দয়ালু, রোগীবান্ধব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডাঃ মঈনুদ্দীন স্যারকে হারানোর ক্ষতি অপূরনীয় । এই অপূরনীয় ক্ষতির খাতায় ক্রমশ যোগ হবে আরো কত ডাক্তারের নাম। যার প্রমান এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ডাক্তারের আক্রান্ত হওয়া ।
আজ লকডাউন ও সাধারনছুটির ছকে পড়ে আপনারা বাসায় যখন পরিবারকে সময় দিচ্ছেন আমরা ডাক্তাররা তখন ডিউটিরত।
আপনি যখন আপনার সন্তানদের নিজহাতে খাওয়াচ্ছেন, গোসল করাচ্ছেন, আমাদের ডাক্তারদের সন্তানরা তখন বারান্দার গ্রিলে মাথা হেলিয়ে পথের পানে চেয়ে থাকে কখন আসবে মা, কখন আসবে বাবা !!!
আপনি যখন পরিবারের বায়োজৈষ্ঠদের স্বাস্থ্যঝুকি নিয়ে চিন্তিত । তাদের প্রতি সেবা যতেœ ব্যস্ত, আমরা ডাক্তাররা তখন তাদের দেয়া ফোনে জেনে নিচ্ছি, তারা কেমন আছে ? কারন আমরা তো কর্মস্থলে অথবা কোয়ারেন্টইনে থাকি। আপনি যখন ২৪ ঘন্টায় প্রায় সবটুকু সময় পার করছেন নিজের সন্তান আর বাবা-মা ভাই বোনের সাথে, তখন আমরা গত দেড় মাস যাবৎ অনেকেই ঘর থেকে দূরে সন্তানদের থেকে বহুদূরে !!!
আপনি ঘরে বসে যখন সন্তানকে অনলাইনে ক্লাস করাতে ব্যাস্ত আর আমরা ব্যস্ত অনলাইন এ করোনা এর ন্যাশনাল গাইডলাইন খুজতে, পিপিই এর ডফিং আর ডনিং শিখতে. . . . . . . ।
ছুটির দিনে এখন আপনি, আপনারা ইউটিউব এর নতুন রেসিপি দেখে রান্না নিয়ে ব্যস্ত, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ব্যস্ত আমরা ডাক্তাররা অনেকেই বাজারের ব্যাগ হাতে বের হই বাজার করতে।
আপনারা যখন গিন্নির গোছানো বেডরুমে এ গা এলিয়ে দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ শেষে বিশ্রামে যান, আমাদের করোনা মহামারীর অনেক যোদ্ধা ডাক্তাররাই ডরমেটরি তে এসে মাসের পর মাস না ধোয়া গন্ধযুক্ত চাদরে গন্ধযুক্ত বালিশে ঘুমিয়ে পড়ে। কারন সে যে ক্লান্ত বড় ক্লান্ত !!
এতগুলো কথা বলার পিছনে উদ্দেশ্য একটাই। হ্যাঁ! আমি চলতে জানি, আমি জয়ী হতে জানি, জয়ী আমরা হবোই, হতে পারে- সেটা বাচার জন্য চিৎকার আর আর্তনাদ করতে করতে, হতে পারে সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হতে , হতে পারে নিজে শেষ হয়ে ডাঃ মঈনু্িদ্দন , ডাঃ ফেরদৌস এর মতো । তবুও জয়ী আমরা হবোই। করোনা মোকাবেলায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়াই করে যাব।
আমরা হারতে শিখিনি,
আমরা হারকে হারাতে জানি।
জয়ী আমরা হবোই ইনশাল্লাহ।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments