
মনির মোল্যা, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
পেঁয়াজের রাজধানী খ্যাত ফরিদপুরের সালথা উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরা এবার বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন। মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার আশায় যারা পেঁয়াজ চাষে আশাবাদী ছিলেন তারা, রমজানের মধ্যেই হঠাৎ করেই বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে যাওয়ায় তাদের সেই আশা ভেঙে গেছে। বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫০ থেকে ১১০০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম।
শুক্রবার (০৬ মার্চ) সরেজমিনে উপজেলার বালিয়া বাজারের পেঁয়াজ হাট ঘুরে দেখা যায়, ক্রেতাদের তুলনায় বিক্রেতার সংখ্যা বেশি। নগদ টাকার প্রয়োজন হওয়ায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়েই কম দামে অপরিপক্ক হালি পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ মনে বাড়ি ফিরছেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সালথা উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি, সেচ ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ফলে বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতিমণে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের।
বালিয়াগট্টি গ্রামের কৃষক জসিমউদ্দিন বলেন, তিনি ৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজের চাষ করেছেন। প্রতি মণ প্রায় ১২ থেকে ১৩ শত টাকা খরচ হয়েছে। যেসব কৃষকের ফলন ভালো হয়েছে তাদের খরচ তুলনামূলক কম পড়েছে, আর যাদের ফলন কম হয়েছে তাদের খরচ বেশি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় যদি ন্যায্য দাম না পাওয়া যায়, তাহলে কৃষকেরা ভবিষ্যতে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে দেশে উৎপাদন কমে গেলে বাইরের দেশ থেকে আমদানি করতে হতে পারে।
বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক শফিকুল বলেন, উৎপাদনে প্রতি মণে প্রায় ১৪শ থেকে ১৫শ টাকা খরচ পড়ে। কারণ কীটনাশক, সার ও বিভিন্ন ঔষধ বেশি দামে কিনতে হয়। কিন্তু বর্তমানে তিনি প্রতিমণ পেঁয়াজ মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।
বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা অপর এক কৃষক হতাশার সুরে বলেন, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক, পানি সব মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজে প্রায় ১৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। এখন বিক্রি করতে হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১১০০ টাকায়। এই লোকসান নিয়ে আমরা কীভাবে সংসার চালাব?
ঐ বাজারে ব্যবসায়ি মেসার্স মালেক ট্রেডার্সের মালিক আব্দুল খালেক বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের বাজার একই অবস্থায় রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে তারা প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫ থেকে ২৬ টাকায় কিনছেন, এতে প্রতি কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা করে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, কৃষকদের বাঁচার জন্য পেঁয়াজই এখন একমাত্র ভরসা। কৃষক যেমন পেঁয়াজ বিক্রি করে বাঁচতে চান, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও তা কিনতে হয়। কিন্তু অনেক সময় একদিনও ঠিকমতো চালান থাকে না। আব্দুল খালেক আরও বলেন, যদি পেঁয়াজের দাম প্রতি মণ ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে থাকত, তাহলে কৃষকেরা যেমন লাভবান হতেন, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও বেচাকেনা ভালো হতো।
সালথা উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে সাপ্তাহিক পেঁয়াজের হাট বসে। এর মধ্যে শনিবার ও বুধবার নকুলহাটি, রবি ও বুধবার ঠেনঠেনিয়া ও সালথা সদর হাট এবং শুক্রবার ও সোমবার বালিয়া গট্টি, কাগদি, জয়কাইল, মোন্তার মোড়, মাঝারদিয়া, বাউষখালী ও যদুনন্দী এলাকায় বড় বড় পেঁয়াজের হাট বসে। এসব হাটে ফরিদপুর ছাড়াও আশপাশের জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকে পাইকাররা এসে ট্রাকভর্তি পেঁয়াজ কিনে নিয়ে যান। তবুও স্থানীয় চাষিরা বলছেন, লোকসানের ট্রাকেই চেপে যাচ্ছে তাদের ঘাম ঝরানো ফলন।
পেঁয়াজ চাষিদের দাবি, পেঁয়াজের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের জন্য সরকারিভাবে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ধান ও গমের মতো পেঁয়াজেও যদি সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়, তাহলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন না। তারা আরও বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে কোল্ডস্টোরেজ বা হিমাগার নির্মাণ করা হলে কৃষকরা সহজে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন সিকদার বলেন, পেঁয়াজের দাম মূলত বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত প্রতি বছর মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজের দাম মোটামুটি ভালো থাকে, তবে চলতি বছরে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে বাজারে চাহিদা তুলনামূলক কম থাকায় দামও কম। এ অবস্থায় অনেক কৃষক ধারদেনা পরিশোধের জন্য বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। তবে কৃষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যদি সম্ভব হয় তাহলে পেঁয়াজ কিছুদিন সংরক্ষণ করে রাখা উচিত। পরবর্তীতে বাজারে চাহিদা বাড়লে তখন বিক্রি করলে তারা ভালো দাম পেতে পারেন।
০৬ মার্চ ২০২৬
